মিলি মুখার্জী

বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশই তাদের জনগণকে বিনামূল্যে শিক্ষা দেয়। এক্ষেত্রে জার্মানি শীর্ষে রয়েছে যেখানে সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলিতে উচ্চশিক্ষা হয় নিখরচায় বা নামমাত্র চার্জ দিতে হয়। নরওয়েতে গ্রেজুয়েশান পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান এবং ডক্টরেট সম্পূর্ণ নিখরচায়। সমস্ত ভাল এবং প্রগতিশীল আইন গুলিকে সর্বপ্রথম প্রয়োগকারী দেশ হলো সুইডেন এখানেও শিক্ষা নিখরচায় , কেবল ইউরোপীয় নয় এমন নাগরিকদের জন্য কিছু নামমাত্র চার্জ চাপায় । এখানে পিএইচডি করার পরে নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় ।-অস্ট্রিয়াতেও শিক্ষা নিখরচায় । অ ইউরোপীয়দের জন্য কিছু নামমাত্র চার্জ রয়েছে । ফিনল্যান্ডে, প্রতিটি স্তরের শিক্ষাই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে, আপনি সে যেখানকারই নাগরিক হন । ২০১৭ থেকে এরা অ- ইউরোপীয়দের উপর কিছুটা চার্জ চাপিয়েছে। চেক রিপাবলিক বিনামূল্যে শিক্ষা দেয় সে আপনি যেখানকার নাগরিক হন । ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষা সম্পূর্ণ নিখরচায় । কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র চার্জ আরোপ করা হয় । বেলজিয়াম এবং গ্রিসে নামমাত্র চার্জে শিক্ষা দেওয়া হয়। স্পেন সমস্ত ইউরোপীয় নাগরিকের জন্য নিখরচায় শিক্ষা পরিসেবা দেয় । এ ছাড়া ডেনমার্ক, আইসল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কিউবা, হাঙ্গেরি, তুরস্ক, স্কটল্যান্ড, মাল্টা ইত্যাদি দেশ স্কুল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সকল প্রকারের শিক্ষা বিনা মূল্যে দেয়।-ফিজিতে স্কুলের শিক্ষা ফ্রি । ইরানের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষা নিখরচায় । রাশিয়ায় মেধার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে শিক্ষা দেওয়া হয়। ফিলিপিন্স ২০১৭ সালে আইন প্রণয়ন করে শিক্ষা বিনামূল্যে করেছে। শ্রীলঙ্কায় স্কুল শিক্ষা এবং মেডিকেল বিনামূল্যে । থাইল্যান্ড ১৯৯৬ সাল থেকে বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করে আসছে । চীন ও আমেরিকার মতো দেশগুলি, যেখানে নিখরচায় শিক্ষা নেই, তারাও এই দিকে এগিয়ে চলেছে । যে সব উন্নত দেশগুলিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিখরচায় সেখানকার সরকার ও জনগন এটাকে ফ্রি বলেনা তারা এটিকে প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার বলে অভিহিত করে । এমন ভাবনার কারন এগুলো উন্নত দেশ এবং সেখানকার মানুষের চিন্তা ভাবনাও খুব উন্নত ও বিকশিত। তারা তাদের নিজস্ব বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কল্পিত বিশ্বাসঘাতকদের সন্ধান করে না। তারা তাদের বিরোধী এবং সমালোচককে দেশের শত্রু হিসাবে বিবেচনা করে না । তারা শিক্ষিত এবং শিক্ষার গুরুত্ব বোঝে, আমাদের আজব দেশে ফি’জ কমাবার দাবি করলে সরকার লাঠিপেটা করে। কোথাও আবার চার গুন ফিজ বাড়াচ্ছে সরকার নিজে।বেসরকারী বিদ্যালয়গুলি যা খুশি করছে ফিজের ব্যাপারে।সরকারের কোন হেলদোল নেই। ২০০৯ সালে ভারতে শিক্ষার অধিকার প্রয়োগ করা হয়েছিল । এই আইন বলছে যে সরকার ৬ বছর থেকে ১৪ বছর বয়সী সমস্ত শিশুদের বাধ্যতামূলকভাবে শিক্ষা প্রদান করবে।যে দেশটি তার আট কোটি বাচ্চাকে শিক্ষা দিতে অক্ষম, সেখানে শিক্ষিত লোকেরা প্রচার চালাচ্ছেন যে শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের সহায়তা বন্ধ করা উচিত। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া উচিত।সরকার তার নীতির মাধ্যমে শিক্ষায় দুটি শ্রেণি তৈরি করেছে। যিনি সক্ষম তার সন্তান একটি বেসরকারী এবং ব্যয়বহুল স্কুলে পড়াশোনা করবে । দরিদ্রের বাচ্চা একটি সরকারী স্কুলে পড়াশোনা করবে। এই শ্রেণীর পার্থক্য ভবিষ্যতে সমস্যা হয়ে উঠবে। সমাজের প্রান্তিকিকরণ সমাজকে বিভক্ত করে।এসোচেম রিপোর্ট দেখলেই জানা যাবে যে , ৯৩% ম্যানেজমেন্ট ছাত্রের ডিগ্রি অকেজো, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার্থীদের ৭০% ডিগ্রি অকেজো, মাত্র ৩৫% শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত স্কুলে পৌঁছায় এবং দশম শ্রেণী পর্যন্ত ৫০% ছেড়ে যায় , তাড়িয়ে দেওয়া হয়।দেশের শীর্ষ দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকদের ৭০% পদ শূন্য রয়েছে, এবং অন্যান্য কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫৮০২ টি পদ শূন্য রয়েছে। আসলে আন্দোলন করে RTE law পাস করতে হয় যে দেশে সে দেশের মানুষের লজ্জা ছাড়া আর কিই বা থাকতে পারে । শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যের মতো সুবিধাগুলি বিশ্বের সমস্ত উন্নত দেশে বিনামূল্যে বা সীমিত চার্জ। সরকারি ভাবে ট্যাক্সে যে সেস আদায় হয় সে টাকাটাই সরকার শিক্ষা খাতে খরচ করেনা , সেটা করলেই উচ্চ-নিম্ন সব শিক্ষাখাতে প্রচুর বরাদ্দ করা যায় । এই পরিসংখ্যান দেখলে লজ্জা হওয়ার কথা , ২০১৭-১৮ গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে ৮ কোটি ৮০ লাখ শিশু স্কুল শিক্ষার বাইরে রয়েছে । জনসত্তার একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ থেকে ১৭ র মধ্যে এই পাঁচ বছরে সারা দেশে প্রায় দেড় লাখ সরকারী স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে । দেশে এক লাখ এমন বিদ্যালয় রয়েছে যেখানে মাত্র একজন শিক্ষক শিক্ষকতা করেন। সরকার এ কথা ২০১৯ সের জানুয়ারিতে সংসদে জানিয়েছিল । সরকারী বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এমনই যে ৫ ম শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিশু দ্বিতীয় শ্রেণির বই পড়তে পারে না, বার্ষিক সমীক্ষার ( Annual Survey of Education Report ) প্রতিবেদনের রিপোর্ট অনুসারে এই তথ্য জানা যায় । ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উত্তরপ্রদেশের ৪০ শতাংশ সরকারী বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ নেই । শিক্ষার বাজেট বৃদ্ধির পরিবর্তে কমে যাচ্ছে । আসলে শিক্ষা মানেই আলো, আলো মানে বিজ্ঞান, যুক্তি-বুদ্ধির স্বাধীন চিন্তা।সিংহভাগ মানুষ যুক্তি-বুদ্ধি বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়ে গেলে তখন তো আর সারা ভারত বর্ষ জুড়ে গনেশ দুধ খাবে না ! এবং মুনাফাবাজরা কোটি কোটি টাকার ব্যবসাও এই ধান্দায় করে নিতে পারবে না। ওই জন্যই সর্ব শিক্ষার অভাব, সদিচ্ছার অভাব, শিক্ষাকে ক্রমশ করে তোলা হচ্ছে বহুমূল্য যাতে গরীব ও সাধারণ মানুষ বিজ্ঞানচেতনার বাইরের অন্ধকারে বসে থাকে। ভারতের অদ্ভুদ শিক্ষা ব্যবস্থা যদি একটি শিশু পাঁচ বছর বয়সে পড়া শুরু করে তাহলে ১৭ বছর বয়সে ইন্টারমিডিয়েট শেষ হয় । ২০ বছর বয়সে গ্রেজুয়েশান , ২২ বছরে পোস্ট গ্রাজুয়েশান , যদি রিসার্চ করে তাহলে আরও পাঁচ বছর তার মানে বয়স গিয়ে দাঁড়ালো ২৭ । এই পাঁচ বছরে, গবেষণা শেষ না হলে কয়েক মাস আরও বাড়লো । ভর্তি ইত্যাদিতে যদি দু এক বছর নষ্ট হয় তবে আরও দুটি বছর ধরে নিন । আপনি যদি পোস্ট-ডক্টরেট করতে চান তবে আরও কয়েক বছর প্রয়োজন ।শুনেছি জীবনে যদি লজ্জার পরিমাণ অতিরিক্ত হয়ে যায় তবে লজ্জা পাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ নির্লজ্জ হয়ে যায় ।

সব শেষে বলি – ফ্রি-তে শৌচালয় দেয় সরকার
ফ্রি-তে শিক্ষা মেলা ভার !
কারন শিক্ষা স্পর্ধা জোগায় প্রশ্ন তোলার 

Categories: Uncategorized

0 Comments

Leave a Reply

Avatar placeholder

Your email address will not be published.